নারী উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই এগিয়ে যাবে অর্থনীতি: নতুন সরকারের প্রতি অগ্রাধিকার দাবী
কামরুন্নাহার লুনা
নতুন সরকারের পথচলা শুরু হয়েছে নতুন স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে। এই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা। আর সেই অর্থনীতিকে গতিশীল করতে সবচেয়ে কার্যকর শক্তি হতে পারেন দেশের নারী উদ্যোক্তারা। তাই সময় এসেছে নারী নেতৃত্বাধীন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্ভাবনা সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই খাতের ভূমিকা অপরিসীম। তবে এই খাতে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নানা কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথকে সংকুচিত করে রেখেছে।
নারী উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি যে সমস্যার মুখোমুখি হন, তা হলো পুঁজির অভাব এবং সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়া। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জামানত ও কাগজপত্রের জটিলতা অনেক সম্ভাবনাময় নারীকে ব্যবসা শুরু করার আগেই নিরুৎসাহিত করে। ফলে প্রয়োজন নারী-বান্ধব আর্থিক নীতি, স্বল্পসুদে ঋণ, বিশেষ তহবিল এবং সহজ প্রক্রিয়ায় অর্থায়নের সুযোগ।
শুধু অর্থায়ন নয়, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও জরুরি। ডিজিটাল বিপণন, ই-কমার্স, ব্র্যান্ডিং, প্যাকেজিং এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের কৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষণ নারীদের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখবে। নতুন সরকার চাইলে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ইনকিউবেশন সেন্টার, শিল্পপার্ক ও রপ্তানি সহায়তা সেল চালু করতে পারে।
গ্রামীণ নারীদের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প একটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। হস্তশিল্প, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য, খাদ্য উৎপাদন, পোশাক ও সেবা খাতে তারা ইতোমধ্যেই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রয়োজন কেবল সঠিক নীতি সহায়তা ও বাজার সংযোগ। সরকারি ক্রয়ে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নির্দিষ্ট অংশ সংরক্ষণ করা হলে তাদের ব্যবসা টেকসই ভিত্তি পাবে।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা। একজন নারী উদ্যোক্তা তার পরিবারের আর্থিক স্থিতি মজবুত করেন, সন্তানদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করেন এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেন। ফলে নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া মানে একটি প্রজন্মকে এগিয়ে নেওয়া।
নতুন সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় যদি নারী নেতৃত্বাধীন এসএমই খাতকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে তা হবে সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়তে হলে নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
অতএব, নারী উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই এগোবে দেশের অর্থনীতি—এটি শুধু একটি শ্লোগান নয়, বরং একটি বাস্তব সম্ভাবনা। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর নীতি এবং বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার। নতুন সরকার যদি এই খাতকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে অর্থনীতির চাকা আরও দ্রুত ঘুরবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।
লেখক : নারী উদ্যোক্তা ও ব্যাবস্থাপনা পরিচালক, লুনা ফ্যাশন হাউস।

